ঘোষণাপত্র

সমাজ সমীক্ষা সংঘ এর ঘোষণাপত্র

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঁয়ত্রিশ বছর অতিক্রান- হয়েছে। এই স্বাধীনতার জন্য আমাদের নেক মূল্যও দিতে হয়েছে শহীদ হয়েছেন অসংখ্য মানুষ সম্ভ্রম হারিয়েছেন অনেকেই। স্বাধীনতার জন্য এই আত্মত্যাগ করতে আমরা কুন্ঠিত হইনি। বীরের রক্তস্নাত ও মাতার অশ্রুসিক্ত এই দেশের স্বাধীনতার বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। আমাদের এ স্বাধীনতা কোন আকস্মিক অর্জন নয়। এর পেছনে আছে এক সুদীর্ঘ সংগ্রামে ইতিহাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই আমাদের দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামের সূচনা হয়। তারপর থেকে পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ধারাবাতিক গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ফলে এবং সর্বশেষে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করি।
দীর্ঘদিনের মুক্তিসংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে আজকের বাংলাদেশের আদর্শিক ভিত্তি গড়ে উঠে। পাকিস-ানি শাসকদের অগতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসন-শোষণের  বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ফলে গণতন্ত্র বাংলাদেশের অন্যতম আদর্শিক উপাদানে পরিণত হয়। মুক্তির সংগ্রামে সর্বশ্রেণীর জনগণের অংশগ্রহণের ফলে সকল শ্রেণীর জনগণের মধ্যে যে সমতার চেতনা গড়ে উঠলো, তার ফলে সমাজতন্ত্র বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রীয় আদর্শরূপে গৃহীত হয়। ধর্মের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভ্রান্তির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিসত্ত্বার উত্থানের স্বীকৃতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের আদর্শ ও আমাদের রাষ্ট্রীয় আদর্শের অঙ্গীভূত হয়। সংবিধানে এই আদর্শসমূহের স্বীকৃতির ফলে আমাদের দেশ ও জাতি এক পথ নির্দেশ পেয়েছিল। কিন্তু অচিরেই আমরা সেই গন্তব্য থেকে বিচ্যুত হলাম।
রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আদর্শ পরিবর্তিত হল। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মাধ্যম প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশে আমরা সামরিক শাসন প্রত্যক্ষ করলাম। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠাগুলোও একে একে তাদের চরিত্র ও সামর্থ্য হারিয়ে ফেললো। সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্র বহাল রইলো বটে, কিন্তু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পরিবেশ নিরুদ্দিষ্ট হয়ে গেল।
সামপ্রদায়িক শক্তির পুনরুত্থানের ফলে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ক্ষুণ্ন হল-ফলে বিপন্ন হলো বিভিন্ন সমপ্রদায়ের জনগণের মধ্যে সমপ্রতি ও সৌহার্দ্যময় সম্পর্ক। ধর্মান্ধশক্তির আসুরিক প্রাধান্যের ফলে এই দেশে মু্‌ক্ত ও স্বাধীন চিন্তার চর্চা আজ প্রায় নিষিদ্ধ হতে চলেছে। রাষ্ট্র ও সমাজে স্বৈরাচারী অসহিষ্ণুতার বিস্তার চর্চা আজ প্রায় নিষিদ্ধ হতে চলেছে। রাষ্ট্র ও সমাজতন্ত্রের চেতনাও আমাদের জাতীয় জীবন থেকে তিরোহিত হয়ে গেল।

আমাদের রজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আজ এক চরম লক্ষ্যহীনতার ও নৈরাজ্য বিরাজ করছে। দেশের ও জনগনের সমস্যা অনুধাবনে এবং এইসব সমস্যার  সমাধান নির্দেশের ক্ষেত্রে আমরা প্রায় সর্বক্ষেত্রেই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি; ফলে এই সংকট তীব্রতর হয়ে উঠেছে।

দেশের শিল্প-বাণিজ্য, কৃষি, শিক্ষা-সংস্কৃতি সর্বক্ষেত্রেই আজ চলছে চরম সংকট ও হতাশা। স্বদেশের স্বার্থ উপক্ষোকারী, সাম্রজ্যবাদী অর্থনীতির তোষক এক নীতিহীন শিল্পমালিকগোষ্ঠী ও বিদেশী পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী বণিকগোষ্ঠীর হাতে আজ আমাদের জাতীয় অর্থনীতি  ও অগ্রগতি জিম্মি হয়ে আছে। দায়িত্বহীন ও মুনাফাসর্বস্ব পুঁজিবাদীদের নির্মম শোষণে আজ দেশের শ্রমিকরাও অসংগঠিত ও অধিকার বঞ্চিত। দেশের কৃষিখাতও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে শিল্প শ্রমিকারও অসংগঠিত ও অধিকার বঞ্চিত। দেশের কৃষিখাত ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে আজ নানা সমস্যা-আক্রান্ত। এই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বায়ানের নামে বিশ্বসাম্রাজ্যদী স্বার্থের নির্দেশে। আজ আমাদের মুদ্রানীতি, রাজস্ব-কাঠামো, বিনোযোগনীতি-এই সবই প্রণীত হচ্ছে বিশ্বব্যাংক ও আই, এম, এফ-এর নির্দেশে। এমনকি গ্যাস ও কয়লার মত আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরও আজ আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র চলছে।
এদেশের রাজনীতির ব্যাপারে বিদেশী শক্তির খবরদারি আজ এতটাই নগ্ন ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, আমাদের সার্বভৌমত্বও আজ বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

এই সকল সম্যসার সঙ্গে বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির আগ্রাসনে ও ষড়যন্ত্রেও আমাদের দেশ, জনগণ বিপন্ন হচ্ছে। বিশ্বায়নের নামে আমাদের শিল্পের বিকাশ রুদ্ধ করা হচ্ছে, কৃষিক্ষেত্রে ও আন্তর্জাতিক পুঁজির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহও আজ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নির্দেশে গৃহীত হচ্ছে। এর ফলে। আমাদের রাষ্ট্রীয় সর্বভৌমত্বও আজ চরম, হুমকির সম্মুখীন। সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতিতেও জাতীয় ঐহিত্য থেকে বিচ্যুত করা হচ্ছে।

দেশের শিক্ষাঙ্গন আজ নৈরাজ্যের শিকার এদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক অন্দোলনে গৌরবময় ভূমিকা পালনকারী ছাত্রসমাজ আজ তাদের আদর্শ ও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। দেশের শিক্ষাঙ্গণগুলো আজ কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

শিক্ষাদর্শের ব্যাপারে সরকারের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিকল্পনার অভাবে শিক্ষা আজ পণ্যে পরিণত হয়েছে। যুক্তিবাদী, উদার কমকুশল ও দেশপ্রেমিক জনশক্তির পরিবর্তে আজ আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সৃষ্টি হচ্ছে দেশ ও  সমাজের প্রয়োজনের ব্যাপারে উদাসীন এবং স্বার্থপর ও দায়িত্বহীন বৃত্তিজীবী শ্রেণীর। বেকারত্বের অভিশাপ আজ তরুণ সমাজকে এক সর্বগ্রাসী হতাশার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। ফলে এই তরুণ সমাজ আজ লক্ষ্য ও উদ্যমহীন।

দেশের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিরাজ করছে চরম নৈরাজ্য ও লক্ষ্যহীনতা সুষ্ঠু ও গণমুখী সংস্কৃতি চর্চার অভাবে আমাদের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিরাজ করছে চরম বন্ধ্যত্ব। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া গণমাধ্যমগুলোতে চলছে অপসংস্কৃতির দৌরাত্ম্য। বাঙালি জীবনের মহত্তম উপাদানে রচিত আমাদের সাংস্কৃতির ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত।
যে বাংলা ভাষার আন্দোলনকে ভিত্তি করে আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সূচনা সেই বাংলাভাষাও আজ সর্বত্র উপেক্ষিত। বিশ্বায়নের অজুহাতে বাংলাভাষার চর্চা ও ব্যবহর সংকুচি মুছে ফেলা হচ্ছে। ফলে, আমরা ক্রমশ আত্ম পরিচয় হীন হয়ে উঠেছি।
বিশ্বব্যাপী ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদের যে উত্থান ঘটেছে, বাংলাদেশও তা থেকে মুক্ত নয়। এই ধর্মান্ধগোষ্ঠী আজ প্রকাশ্যে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের এই ধরণের তৎপরতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ থেকে মুক্ত চিন্তার চর্চা চিরতরে নির্বাসিত হবে এবং এদেশ একটি মধ্যযুগীয় তমসায় নিমজ্জিত হবে।
কিন’ এই ধরণের অবস্থা একটি জাতির জীবনে চিরস্থায়ী হতে পারে না। যে সংকট আমাদের জাতীয় জীবনে চলছে তা থেকে মুক্তির পথ আমাদের অন্বেষণ ও আবিষ্কার করতে হবে। আমরা এদেশর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ, বিশেষত যুবসমাজের শুভবুদ্ধি ও সৃজনশক্তির ব্যাপারে আজও আস্থাবান। আমরা মনে করি, সঠিক দিশা পেলে এই যুবসমাজই বাংলাদেশকে আবার একটি শোষণমু্‌ক্ত, অসামপ্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারবে।
আমরা আজ যে সংকট ও সমস্যার সম্মুখীন তা বেশ ব্যাপক, গভীর ও জটিল। কিন্তু সংকটের জটিলতা ও ব্যাপকতায় আজ বিহ্বল, নিরাশ ও নিশ্চষ্ট হয়ে বসে থাকার সময় নেই। এই দেশ, রাষ্ট্র, এই সমাজ আমাদেরই। এই দেশকে, এই সমাজকে সংকটের অমানিশা থেকে মু্‌ক্ত করার দায়িত্ব আমাদেরই। দেশ ও জাতির এই সংকটকালে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালনে ব্যার্থ হলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। কিন্তু এই দায়িত্ব পালন করার জন্য চাই ব্যাপক প্রস্তুতি। দেশের সমস্যাবলি উপলদ্ধি করার জন্য চাই সদিচ্ছা, ব্যাপক অনুসন্ধান ও অধ্যায়ন। দেশের ও জনগণের সমস্যবলি উপলদ্ধির ব্যাপারে আন্তরিক, সদিচ্ছার অধিকারী, অধ্যয়নস্পৃহ, মুক্ত ও উদার দৃষ্টিসম্পন্ন এবং নিস্বার্থ এই কর্মীবাহিনীই এই সংকট থেকে উত্তরণের আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এই উপলদ্ধি থেকেই এবং এই বিশ্বাস ও উদ্দেশ্য নিয়ে। সমাজ সমীক্ষা সংঘ তার যাত্র শুরু করেছে।
আমরা মনে করি, এই দেশের ও জনগণের সমস্যাবলি উপলদ্ধির ব্যাপারে আমরা সকলে সচেতন হলে বাংলাদেশর থেকে আজকের এই অমানিশা কেটে যাবে।
সমাজ-সমীক্ষা সংঘ একটি সমাজ সচেতন গবেষণাধর্মী সংগঠন হিসেবে দেশ ও জনগণের বিভিন্ন সমস্যাবলী সম্পর্কে অধ্যয়ন করবে এবং জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে।
এই লক্ষ্য সাধনের উদ্দেশে আমরা একদল দেশের সমস্যা-সচেতন, নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদল সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করতে চাই। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সমাজ সমীক্ষা সংঘ নিম্নলিখিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে :
সমাজ-সমীক্ষা সংঘ দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন জনগণকে, বিশেষত তরুণ সমাজকে সংগঠিত করবে।
দেশের সমস্যাবলি উপলদ্ধি ও তার সমাধান অন্বেষণের জন্য সংগঠনের কর্মীদের উদ্ধুদ্ধ করবে।
এদেশের তরুণসমাজকে অধ্যয়নে ও চিন্তায় উদ্ধুদ্ধ করার জন্য দেশের বিভিন্ন সমস্যাবলি সম্পর্কে নিয়মিত সেমিনার, পাঠচক্র ও কর্মশালার আয়োজন করবে।
দেশের সমস্যাবলি সম্পর্কে  গবেষণা প্রকল্প গ্রহন করবে এবং এই গবেষণামূহের ফল নিয়মিতভাবে দেশের জনগণ ও নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরবে।
দেশের সমস্যাবলি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করবে এবং এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ও আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ন যে কোন আন্দোলনে সমর্থন যোগাবে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়মিত অধ্যয়ন, আলোচনার আয়োজন করবে।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নেবে।

TOP
Facebook